কৃষি জমিগুলোতে তলিয়ে গেছে বানের জলে কৃষাণের ফসল

সংবাদটি শেয়ার করুন
0Shares

আলোকিত শীতলক্ষ্যা রিপোর্ট : ঋতুতে এখন বর্ষকাল। বর্ষার আগমনে জীবন ফিরে পেয়েছে মৃতপ্রায় নদ-নদীগুলো। গেল কয়েক দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে নদীর পানি। পানির উচ্চতা বেড়ে বানে পরিনত হয়েছে। ফলে নদী বেষ্টিত অঞ্চলের কৃষি জমিগুলোতে প্রবেশ করছে বানের পানি। তলিয়েছে ফসলাদি।

শুক্রবার (৩ জুলাই) সরেজমিনে ধলেশ^রী নদী বেষ্টিত বক্তাবলি ও আলীরটেক ইউনিয়নের কৃষি জমিগুলোতে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

অথচ, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষি খাতের প্রাণকেন্দ্র বক্তাবলি ও আলীরটেক ইউনিয়ন। যুগের পর যুগ খাদ্যশস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে ধলেশ^রী নদী বেষ্টিত এই দুই ইউনিয়নের চাষিরা। ভৌগলিক কারণে কৃষি কাজ এখানকার মানুষগুলোর প্রধান পেশা। ঊর্বর ভূমি এবং মিঠা পানির বদান্যতায় ফসলের ভালো ফলন হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের কৃষিরাজ্যও বলা হয় ওই অঞ্চলকে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার মোট ৩ হাজার ৭শত ৫৮ হেক্টর জমির মধ্যে বক্তাবললি ও আলীরটেক ইউনিয়নেই অন্তত ২ হাজার হেক্টরের বেশি পরিমাণ কৃষি জমি রয়েছে। এরমধ্যে চাষাবাদে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বক্তাবলি ইউনিয়ন।

তবে, প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে নদে বানের পানি আসলে বিভিন্ন শাখা খাল বেয়ে তা এই অঞ্চলের ফসলি জমিতে প্রবেশ করে। কিন্তু এবছর তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, প্রতিবছর আষাঢ়ের শেষে স্বল্প পরিমাণে পানি আসলেও এবার অন্তত ২০ দিন পূর্বেই পানিতে ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যারা নতুন করে আবাদ করেছিলেন তারা তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। ভুট্টা, বেগুন, ঢেরশ, করলা, লাল শাক, লাউ ও কুমড়াসহ বিভিন্ন চাহিদা সম্পন্ন ফসলাদির ক্ষেত তলিয়েছে। কোথায় হাঁটু আবার কোথাও কোমড় পানিও জমেছে। আগামী কয়েক দিনে এই পানি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। ফলে অবশিষ্ট শুকনো ও আবাদি জমিগুলোও পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এই বানের পানি অন্তত তিন মাস দীর্ঘস্থায়ী হবে।

এদিকে, আচমকা ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় এবং কাঙ্খিত ফসল ঘরে তুলতে না পারায় ব্যপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই অঞ্চলের অসংখ্য কৃষি পরিবার। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই ব্যাঙ্ক বা বিভিন্ন এনজিও থেকে লোন উত্তোলন করে আবাদ করেছিলেন।

এদের মধ্যে বেশির ভাগই অন্যের জমি বর্গা নিয়ে বিভিন্ন বীজ রোপন করেছিলেন। ৫০ হাজার থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকাও ঋণ করেছিলেন কৃষকরা। আবার কেউ কেউ এবছরের বিগত দিনে অন্যান্য ফসলাদি উৎপাদন করে যা লাভ করেছিলেন তা এই মৌসুমে আবারও বীজ রোপনে ব্যয় করেন। কিন্তু অতি লাভের আশায় যেই ‘গুড়’ ছিটিয়েছেন, তা ভেসে গেছে বানের জলে!

সরেজমিনে কথা হয় কৃষক আব্দুস সাত্তারের সাথে। তিনি বক্তাবলী কানাইনগর এলাকার বাসিন্দা। ৫৫ বছর বয়সী এই কৃষক আক্ষেপ নিয়ে যুগের চিন্তাকে বলেন, “এই বছর ২১০ শতাংশ জমিতে আবাদ করছি। কিছুদিন আগে ঢেরশ, দুন্দুল, পাট, লাল শাক, লাউ আর ইরি ধানের আবাদ করছিলাম। ফসলগুলা এহনো পরিপক্ক অয় নাই। তার আগেই নদীর পানি ঢুইকা সব তলাইয়া গেছে। আমার নিজের অল্প কিছু জমি, আর বেশির ভাগই বর্গা নিছিলাম। ১ বিঘা জমির বর্গা ১৪ হাজার টাকা। আরোতো খরচ আছে। ব্রাক ব্যাঙ্ক থেইকা ১ লাখ টাকা লোন নিছিলাম। সব মিলাইয়া দেড় লাখ টাকার মত খরচ করছি। ফসলগুলা ঘরে তুলতে পারলে বাইচা যাইতাম। এহনতো সব শ্যাষ। সব তলাইয়া গেল।”

জানতে চাইলে কৃষক আব্দুস সাত্তার আরও বলেন, “বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ^রী নদীর থিকা শাখা খাল আইছে। চাইর পাশেই নদী আর খাল। পদ্মার পানি বাইড়া যাওনে ধলেশ^রীতে পানি আইছে। হেই পানি খাল ভইরা জমির মইধ্যে ঢুকছে। প্রতিবছরেই পানি আহে। কিন্তু এই বছর ২০ দিন আগেই পানি আইয়া পরল। ২০ দিন পরে পানি ঢুকলেও ফসলগুলা ঘরে নিতে পারতাম।”

আক্ষেপ প্রকাশ করে এই কৃষক বলেন, “৩ মাইয়া ২ পোলার মইধ্যে বড় পোলা হারুন ১ বছর ধইরা কুয়েতে গেছে। ফ্রি ভিসায় যাওনে এহনো কোনো কাম পায় নাই। আর পাইবো ক্যামনে, করোনার লাইগা হেই দেশেওতো লকডাউন। পোলারে উল্টা ঋণ কইরা খরচ দিতাছি।”

একই আক্ষেপ কৃষক আমজত আলীর। তিনি কানাইনগর এলাকার সাহেদ আলীর ছেলে। পিতার সূত্রে কৃষি কাজ করছেন। কদিন আগে ৪৫ শতাংশ জমিতে ইরিধান এবং ৪৫ শতাংশে আমন ধান রোপন করেছিলেন। সবেমাত্র মাটি থেকে ধানের পাতা বের হচ্ছিল। এর মধ্যেই সব তলিয়ে সেখানে হাটু পানি জমেছে। তবে, পানিতে আমনের ফলন হবে বলে আশাবাদি হলেও ইরিধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

যুগের চিন্তাকে কৃষক আজমত আলী বলেন, “৪দিন হইলো আবাদি জমিতে পানি ঢুকছে। পানির লাইগা ধানতো দেহনি যায় না। পানি আইয়া আবাদি জমি গুলা বিলের মত হইয়া গেছে। কিছু জমি বর্গা নিছিলাম। প্রায় ৫০ হাজার টাকার মত লোকশান হইলো। আরো তিন মাস পানি থাকবো। এই তিন মাসে চাষ বন্ধ। কিছু উঁচা জমিতে বেগুন আর ঢেরশ বুনছি। এহনো হেগুলা ভালা আছে। পানি লাগর পায় নাই। কিন্তু কবে যে তলাই যায় আল্লায় জানে।”

এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম শওকত আলী যুগের চিন্তাকে বলেন, “নিম্নাঞ্চল হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষাকালে নদীর পানি বেড়ে কৃষি জমিগুলো তলিয়ে যায়। কিছু ফসল হয়তো কৃষকরা ঘরে তুলতে পেরেছে। তবে, কোনো কৃষক যদি আমাকে জানায় যে, বর্ষার কারণে ফসল তুলতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বা রবি ফসল ঘরে তুলতে পারেনি, তাহলে আমি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলব। যদি কোন বরাদ্ধ থাকে তা কৃষকদের পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করবো।”

জানতে চাইলে সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. গাফ্ফার যুগের চিন্তাকে বলেন, “বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। সরকার যদি কোনো সহযোগিতা করেন, তাহলে তা কৃষকদের দেয়া হবে।”

তিনি বলেন, “এখানে মূলত শীত বা রবি মৌসুমে চাষ হয়। রবি মৌসুমী ফসল কৃষকরা ঘরে তুলেছেন। এখানে বর্ষার আগে ৭ থেকে ৮ মাস পুরোদস্তর চাষাবাদ হয়। এই সময়ের মধ্যেই কৃষকরা তাদের কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন করেন। আর বর্ষাকালে পানিতেও আমন ধানের চাষাবাদ হয়। অনেকেই আমন ধান লাগিয়েছেন। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে যারা পুণরায় অন্যান্য ফসলের বীজ রোপন করেছেন, পানি চলে আসায় তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এখানে প্রতিবছরই বর্ষার পানি আসে।”

এদিকে আগামী ৩ মাস পানির কারণে চাষাবাদ বন্ধ থাকবে কৃষকদের। এভাবে আবাদি জমি তলিয়ে যাওয়ায় ও তিন মাস আবাদ করতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। কারো কারো মাথায় ব্যাঙ্ক লোনসহ বিভিন্ন এনজিও’র ঋণের বোঝাও রয়েছে। তাই সরকারের সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছে নদী বেষ্টিত প্রত্যন্ত অঞ্চচলের এই চাষিরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন
0Shares

আলোকিত শীতলক্ষ্যা

পরিশ্রমকারীব্যক্তি কখনও ব্যর্থ হয়না এগিয়ে যাও সফল হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Follow Us

Follow us on Facebook Us on Twitter On WhatsApp Us